Date and Time June 25, 2017 1:09 am   বাংলাদেশ সময়
For showing Bangla
bd24live.com logo
Latest News

হাবের দুর্নীতি: শুধু স্বাক্ষরের দাম পৌনে ৩ কোটি টাকা!

Fiji Visa exempted for Bangladeshi

»
February 10, 2016 at 8:50 am

হজ-২০১৫: মক্কায় অবস্থান ও হাজী সমাচার


Download PDF

হজ-২০১৫: মক্কায় অবস্থান ও হাজী সমাচার

লেখক একজন হাজী সাহেব

হজ শেষে মিনা থেকে হাজীদের মক্কায় ফিরে আসতে হয়। সেখান থেকে শুরু হয় বিদায়ের পালা। কেউ চলে যান দেশে, কেউ যান মদিনা। তবে, চলে যাবার আগে তাওয়াফ করে আল্লাহর ঘর থেকে বিদায় নিতে হয়। বিদায়পর্বটি নির্ভর করে হজ কাফেলার সিডিউলের উপর। যাদের সিডিউল আগে তাঁরা আগে যাবেন। অন্যরা মক্কায় অবস্থান করবেন। অবস্থানকালীন সময়ে তাঁরা হারাম শরীফে নামাজ পড়বেন, কা’বা শরীফ তাওয়াফ করবেন, মক্কার ঐতিহাসিক স্থানসমূহ ঘুরে ফিরে দেখবেন, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী খরিদ করবেন। এহেন ব্যস্ততার মধ্যে দিন কেটে যাবে। দিন শেষে রাত আসবে, রাত শেষে ভোর হবে। সময়ের রথে চড়ে একদিন বিদায়ের ঘন্টা বাজবে। তখন শুরু হবে বিদায়ের পালা। মক্কা শরীফ থেকে বিদায় নেয়া খুবই কঠিন কাজ। যেই শহরে আল্লাহর ঘর কা’বা এবং মসজিদুল হারাম অবস্থিত, মহানবী (সা:) এর জন্মভুমি পূণ্যময় সেই নিরাপদ নগরী ছেড়ে আসতে প্রতিটি হাজীর হৃদকম্পন হয়, দুই নয়ন হয় অশ্রুসিক্ত। দেশের টানে, জীবন জীবিকার সন্ধানে তবুও চলে আসতে হয়।
ইসকপ হজ কাফেলার মদিনায় আসার সিডিউল ছিল ১৭ অক্টোবর ২০১৫ইং তারিখে। আমার সিডিউল ছিল ১০ অক্টোবর। ফলে হজ পরবর্তী আরো ১৫দিন আমি মক্কায় ছিলাম। নামাজ কালাম পড়ে কা’বা শরীফ তাওয়াফ করে ১৫ দিন কিভাবে কেটে গেল বুঝতে পারিনি। নামাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় বের করে বিভিন্ন হজ কাফেলা ঘুরে দেখতাম। এভাবেই একদিন গেলাম মেয়র হজ কাফেলা, চট্টগ্রাম এর হোটেল। উদ্দেশ্য সাবেক মেয়র জননেতা আলহাজ এ.বি.এম. মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করা। শুনেছি তিনি ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। তাঁদের হোটেলে আমাকে দেখে সুজন ভাই জড়িয়ে ধরলেন। সুজন ভাইয়ের সাথে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তিনি সরল মনের মানুষ, মানব কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। মেয়র সাহেব তাঁর বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। সালাম দিয়ে তাঁর কুশলাদি জিজ্ঞেস করলাম। শারিরীকভাবে দুর্বল হলেও তাঁর মনোবল ছিল খুবই শক্ত। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে তিনি কিভাবে হজব্রত পালন করলেন তা ভাবতেও আশ্চর্য লাগে। মেয়রের সাথে দেখা করার সময় আমার সাথে ছিলেন সুগন্ধা সিটি কর্পোরেশন জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মহিউদ্দিন এবং বড় দিঘির পাড় নুসরাত শাহ জামে মসজিদের খতিব মওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ ফারুকী।
মেয়র হজ কাফেলার হোটেলটি ছিল মিসফালাহ্র ইব্রাহীম খলিল রোডস্থ লোহাগাড়া মার্কেট গলিতে। হোটেলটি মধ্যম মানের হলেও হারাম শরীফের মোটামুটি কাছে ছিল। আলাপচারিতা শেষে সেখান থেকে আমরা বিদায় নিলাম। পরবর্তীতে গেলাম বায়তুশ্ শরফ হজ কাফেলার হোটেলে। বায়তুশ্ শরফের হাজীগণ এ বছর শাহ আমানত হজ কাফেলার মাধ্যমে হজে গিয়েছেন। বায়তুশ শরফের পীর হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (মজিআ) আমাদের কে সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁর সাথে আমার দীর্ঘ তিন যুগের বেশী সময়ের পরিচয়। আমি এবং আমার পিতা-মাতা বায়তুশ শরফের হুজুর কেবলা মরহুম হযরত শাহ সূফী মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ:) এর মুরিদ। এছাড়া ২০০০ সালে বায়তুশ শরফ হজ কাফেলার সাথে আমি হজব্রত পালন করেছি। সেই কাফেলার নেতা ছিলেন হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (মজিআ)। কাজেই তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও গভীর। বায়তুশ শরফ একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে লোভ-লালসার উর্ধ্বে থেকে নীতি-নৈতিকতা, ধর্ম-কর্ম, দ্বীন-দুনিয়া ইহকাল-পরকাল, সততা ও মানবতা সকল বিষয়ে সঠিক তালিম দেয়া হয়। আল্লাহর রাহে মানবতার কল্যাণে কাজ করা হয়। এহেন নিবেদিত প্রাণ প্রতিষ্ঠানের হাজীদের সাথে দেখা করা সওয়াবের কাজ। তাই আমি হুজুরের দোয়া নিতে সেখানে গিয়েছিলাম।
পরদিন রাতে গেলাম ‘হজ্জে বায়তুল্লাহ’ হজ কাফেলার হোটেলে। হোটেলটি ইসকপ হজ কাফেলার ই গ্রুপের হোটেলের বিপরীত পাশে অবস্থিত। সেই হজ কাফেলার পরিচালক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সিডিএ জামে মসজিদের খতিব মাওলানা গিয়াস উদ্দিন তালুকদার। কাফেলার হাজীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন পেশার লোক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন আমার ঘনিষ্ট বন্ধু।
সেই বন্ধুদের সাথে দেখা করাই ছিল সেখানে যাওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য। মাওলানা গিয়াস উদ্দিন তালুকদারের অনেক সুনাম শুনেছি কিন্তু তাঁর সাথে আমার পরিচয় ছিলনা। মক্কা শরীফেই প্রথম পরিচয় হলো। তাঁর কাফেলার হোটেলের ডাইনিং রুমে বসে আমরা এক সাথে রাতের খাবার খেলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে হজ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করলাম। আলাপকালে বুঝতে পারলাম তিনি একজন বড় মাপের আলেম এবং হজ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ। কাফেলার হাজীগণ তাঁর উপর খুবই সন্তুষ্ট। আমি ব্যক্তিগতভঅবে উপলব্ধি করলাম মওলানা গিয়াস উদ্দিন তালুকদার তাঁর হজ কাফেলার আমীর বা নেতা নয় বরং একজন খাদেম হিসেবে হাজীদের সেবা করেছেন। আলাপকালে জানতে পারলাম তাঁর কাফেলার হাজীগণ প্রথমে মক্কায় যান। সেখানে সকলে ওমরাহ করেন। পরে চলে যান মদিনা। মদিনা শরীফে কিছূদিন কাটিয়ে হজের পূর্বে মক্কা আসেন। হজ শুরু হবার পূর্বে তিনি হজ কাফেলার সদস্যদের মক্কার ঐতিহাসিক স্থানসমূহ যথা-মিনা, মুযদালিফা, আরাফাহ, জামারাত ইত্যাদি দর্শনে নিয়ে যান। এই সকল স্থানেই পরবর্তীতে হজের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। পরে শুরু হয় হজের মূল কাজ। হজ শেষে হাজীগণ দেশে ফিরে আসবেন। মধ্যখানে কিছুদিন সময় ছিল। ঐ সময়ের মাঝখানে তিনি হাজীদের নিয়ে যান মহানবী (সা:) এর করুণ স্মৃতিবিজড়িত শহর তায়েফে। এবাদত-বন্দেগীর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রোগ্রাম দিয়ে হাজীদের ব্যস্ত রাখাই ছিল তাঁর মূখ্য উদ্দেশ্য যাতে হাজীগণ বিরক্তিবোধ না করেন। ইসকপ হজ্ব কাফেলার আয়োজনও তুলনামুলকভাবে ভাল ছিল। কিন্তু ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে হাজীগণ কষ্ট পেয়েছেন। এ ছাড়া ঐ কাফেলার অ গ্রুপে কোন অভিজ্ঞ আলেম ছিলনা যিনি হাজীদের তালিম দেয়া, সুযোগ-সুবিধা দেখভাল করা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে দেন-দরবার করতে পারতেন।
হারাম শরীফের চারিদিকের রাস্তায় অবস্থিত হোটেলগুলো ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হাজীতে ভরপুর। কোথাও তিল ধারনের জায়গা নেই। হোটেলগুলোর সামনে প্রত্যেক হজ কাফেলার ব্যানার টাঙানো থাকে। মিসফালাহ, নাক্কাশা ও গাজ্জা এলাকায় বাংলাদেশী হজ কাফেলার সংখ্যা বেশি ছিল। এই এলাকাসমূহ বাঙালি পাড়া হিসেবে পরিচিত। হোটেল রেস্তোরাঁ দোকান-পাঠ সবখানেই বাংলাদেশীদের সরব উপস্থিতি। এছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশের হাজীগণও এই সকল এলাকায় অধিকহারে থাকেন। ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশের হাজীদের সাথে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। এদের মধ্যে মিয়ানমারের হাজীদের ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল খুব বেশি। কারণ, মিয়ানমারে সামরিক জান্তা সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে মুসলিম নিধন অভিযান চলছিল। সেই অবস্থায় সেদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মুসলমান হজ করতে আসা রীতিমত বিস্ময়ের ব্যাপার। মিসফালাহ’র ইব্রাহীম খলিল রোডে মিয়ানমারের যে সকল হজ কাফেলা ছিল সেগুলোর মধ্যে ১) চবধপব গড়ঁহঃধরহ ঞৎধাবষং (ঝধভধ এৎড়ঁঢ়). ২) ঐধলবব ঘধহরঢ়ঢ়ধ এৎড়ঁঢ়. ৩) ওসধমরহম ঈড়ৎহবৎ. ৪) ঋঁঃঁৎব ডরহমং. ৫) ঋড়ৎবসড়ংঃ এধষধীু ঞৎধাবষং ধহফ ঞড়ঁৎং ঈড়. খঃফ. আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই হজ কাফেলাগুলো মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন ভিত্তিক। এই কাফেলাসমূহের কয়েকজন হাজীর সাথে আলাপ করে জানতে পেরেছি আরকান প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমান ছাড়া মিয়ানমারের অন্যান্য প্রদেশে মুসলমানদের কোন সমস্যা নেই। তাঁরা সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন। তবে সংখ্যালঘুদের উপর সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য বিশ্বের সব দেশেই কম বেশি থাকে।
নামাজের জামাত শেষে আমার দুই পাশের মুসল্লীকে সালাম দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতাম। তাঁদের মধ্যে বিশ্বের নানা দেশের হাজী ছিলেন। একদিন মিশরের এক বয়স্ক হাজী কপালে চুমু দিয়ে আমাকে আদর করেন। আরেকদিন ভারতের গুজরাটের এক হাজীর সাথে পরিচয় হয়। হজে আসতে তাঁর কাফেলার প্যাকেজ ছিল ২ লক্ষ ৬০ হাজার রুপি। সেখানে মুসলমানদের অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, বিজেপি সরকারের আমলে মুসলমানগণ খুব চাপে থাকে। রাস্তায় নামাজ পড়ার সময় পাকিস্তানি এক হাজীর সাথে পরিচয় হয়। তিনি করাচীতে থাকেন, সম্ভবত বিহারী। এক সময় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-ঢাকা-সৈয়দপুরে রেলওয়েতে চাকুরী করেছেন। মনে হলো বাংলা জানেন ও বুঝেন। কিন্তু চালাকি করে আমার সাথে উর্দুতে কথা বলেছেন। তাঁর কাফেলার হজ প্যাকেজ ছিল ৪ লক্ষ ২০ হাজার রুপি। তাঁর দেশের অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করলে আমতা আমতা করে জবাব দিল-ভাল।
আমি বললাম, পাকিস্তান মুসলমানদের দেশ, সেদেশে তো আল্লাহর ঘর মসজিদও নিরাপদ নয়। তিনি নীরব রইলেন, কোন উত্তর দিলেন না। আসলেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও ভাল নয়। মানি চেঞ্জারসূত্রে জানতে পারলাম, সৌদি ১ রিয়াল সমান বাংলাদেশী ২১ টাকা, ভারতীয় ১৮ রুপি এবং পাকিস্তানি ২৮ রুপি। মুদ্রার মান থেকে বুঝা গেল আল্লাহর রহমতে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার এক হাজী, জীর্ণ শির্ণ দেহ। ছেলে জেদ্দায় চাকুরী করেন। পিতাকে হজে এনেছেন। মক্কায় অবস্থানকালে সময়ে ভদ্রলোক অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলে তাঁকে জেদ্দা নিয়ে যান। সেখানে ১২ দিন থাকার পর আবার মক্কায় আসেন। তখন হজ শুরু হবার তিনদিন বাকি। আলাপকালে মনে হলো শারিরীকভাবে দুর্বল হলেও মানসিকভাবে তিনি খুবই শক্ত। তাই সাহস করে হজে এসেছেন। সত্যই হজে আসা একান্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর হজকালীন মৃত্যু অতি মর্যাদাপূর্ণ।
একদিন মাগরিবের নামাজের পর সাতক্ষীরা জেলার এক হাজীর সাথে কথা হয়। হজে প্রথম এসছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে উত্তরে বলেন, তিনি ১৯৮৬ সালে হজ করেছেন। এবার তাঁর বাবার বদলী হজে এসেছেন। কোন ছেলে সৌদি আরবে কর্মরত কিনা জানতে চাইলে ভদ্রলোক গর্ব করে বলেন, তাঁর তিনটি মাছের ঘের আছে। তিন ছেলে সেগুলো দেখভাল করেন। এতে যে আয় হয় তা দিয়ে স্বচ্ছন্দে সংসার চলে। আয়-উপার্জনের জন্য তাঁর ছেলেদের বিদেশে আসতে হয় না।
দ্বিতীয়বার হজে এসেছেন শুনে আমি তাঁর কপালে হাত বুলিয়ে দিলাম। বললাম আপনি অতি সৌভাগ্যবান, অনেকের ধন-দৌলত থাকলেও কপালে হজ জুটে না। আপনি দুইবার হজে এসেছেন। উত্তরে তিনি বললেন হজ ধনীদের কাজ নয়, ফকিরের কাজ। অর্থাৎ যাঁরা হজে আসবেন তাঁদের আল্লাহর রাহে ফকির হয়ে যেতে হয়। একজন সাধারণ মানুষের মুখে অসাধারণ কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম।

         


বাংলাদেশ সময়: February 10, 2016 at 8:50 am

ইসলাম-এর সর্বশেষ ২৪ খবর

Line
 
Must See Places In Paris
Free track counters
Thanks Dear Visitor
Hajjsangbad.com